উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলের আসল রূপ দেখতে চাইলে রাজশাহী থেকে ডে ট্যুর দারুণ এক অভিজ্ঞতা হতে পারে। পদ্মাপাড়ের শান্ত স্নিগ্ধ রাজশাহী শহরটা ঘুরে দেখার পর একটু আশপাশে নজর দিলেই বোঝা যায় এখানকার মাটির টান। শহরের সীমানা ছাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে ২০০ বছরের পুরনো টেরাকোটা মন্দির, মাইলের পর মাইল ফলের বাগান আর শীতের দিনের ঐতিহ্যবাহী গুড়ের ভাঁটি।
১. পুঠিয়া: টেরাকোটার রূপকথা ও দিঘির মাছ চাষ (পূর্ব দিকে ৩০ কিমি)
রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক ধরে পূর্বে মাত্র ৩০ কিলোমিটার এগোলেই পুঠিয়া। দেশের সবচেয়ে বেশি ঐতিহাসিক হিন্দু মন্দিরের দেখা মেলে এই এক জায়গাতেই। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে পুঠিয়ার জমিদাররা এই রাজবাড়ি ও মন্দিরগুলো তৈরি করেছিলেন। এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির। এর দেওয়ালজুড়ে থাকা রামায়ণ ও মহাভারতের পোড়ামাটির সূক্ষ্ম কাজ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে। ঠিক পাশেই সুবিশাল শিব সাগর দিঘি, যার পাড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল শিব মন্দির।
পুরনো কারুকাজ ছাড়াও পুঠিয়ার গ্রামীণ রূপ বেশ প্রাণবন্ত। রাজবাড়ির সীমানা পেরোলেই চোখে পড়বে বিঘার পর বিঘা আখের জমি আর অমৃতসাগর ও সবরি কলার বাণিজ্যিক বাগান। জমিদারদের তৈরি বড় বড় দিঘিগুলো এখনো ফেলে রাখা হয়নি; সেখানে পুরোদমে মিষ্টি পানির মাছ চাষ হয়, যা এখানকার স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।
যেতে চাইলে রাজশাহী থেকে নাটোর বা ঢাকাগামী যেকোনো বাসে উঠে পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ডে নেমে পড়ুন। সেখান থেকে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকে পাঁচ মিনিটেই মন্দির চত্বর। পুরো রাজবাড়ি আর দিঘির আশপাশ ভালো করে ঘুরে দেখতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় হাতে রাখলেই চলবে।
২. বাঘা: ফলের বাগান, টেরাকোটা ঐতিহ্য ও শীতের খেজুর রস (দক্ষিণ-পূর্বে ৪০ কিমি)
শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলা। ইতিহাস আর কৃষির মেলবন্ধন দেখতে চাইলে বাঘায় যাওয়া চাই। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে সুলতানি আমলে তৈরি ঐতিহাসিক বাঘা মসজিদটি এখনো তার পোড়ামাটির লতাপাতার নিখুঁত নকশা নিয়ে টিকে আছে। মসজিদের সামনেই প্রায় ৪০ একরের এক বিশাল দিঘি, যার পাড়ে ছায়া দিচ্ছে বহু পুরনো সব গাছপালা।
ঐতিহ্যের পাশাপাশি ফলের বাগান আর খাঁটি গুড়ের মোকাম হিসেবেও বাঘার বেশ নামডাক। গরমের দিনে পুরো এলাকা আমের সবুজে ঢেকে যায়, আর কার্তিকের শেষে শীত নামতেই শুরু হয় গাছিদের হাঁড়ি পাতার ব্যস্ততা। রাতের তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে অভিজ্ঞ গাছিরা খেজুর গাছ চাঁচেন; রস সংগ্রহের এই কর্মযজ্ঞ চলে মধ্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
বাঘার মেঠোপথে হাঁটলে চোখে পড়বে বড় লোহার কড়াইয়ে তাজা রস জ্বাল দেওয়ার চিরাচরিত দৃশ্য। সেখানে টানা ১ থেকে ৩ ঘণ্টা রস ফুটানো হয়। রস নামানোর সময় ১০° থেকে ১২° ব্রিক্স ঘনত্বের সেই মিষ্টি তরল জ্বাল পেয়ে ঘন লালচে ঝোলা গুড়ে রূপ নেয়। আর তাপমাত্রা যখন ১১৫° থেকে ১১৮° সেলসিয়াসে ওঠে, তখন কড়াই নামিয়ে ঘুঁটে তৈরি করা হয় দানাদার পাটালি। এই খাঁটি উপায়েই তৈরি হয় মনমাতানো সুবাসের আসল date palm jaggery।
তবে শীতের দিনে ঘুরতে গেলে একটা বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি: রাস্তার ধারের কাঁচা খেজুরের রস খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। বুনো বাদুড়ের (Pteropus giganteus) লালা বা সংস্পর্শ থেকে কাঁচা রসে মারাত্মক নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে[6]। আশার কথা হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপে ফোটালে এই ভাইরাস আর বাঁচে না। তাই সঠিক নিয়মে জ্বাল দেওয়া পাটালি বা ঝোলা গুড় নির্দ্বিধায় খাওয়া যায়[5]।

৩. নাটোর: রাজবাড়ি, সুগার মিল ও আসল কাঁচাগোল্লা (পূর্ব দিকে ৪৮ কিমি)
রাজশাহী থেকে মহাসড়ক ধরে ৪৮ কিলোমিটার মতো পূর্বে গেলে নাটোর শহর। রানি ভবানীর স্মৃতিমাখা এই শহরে দেখার মতো দুটি বড় জায়গা রয়েছে—একট পরিখা ঘেরা নাটোর রাজবাড়ি, আর অন্যটি দিঘাপতিয়া রাজাদের তৈরি উত্তরা গণভবন, যা এখন প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় সরকারি বাসভবন।
কৃষিভিত্তিক কলকারখানার দিক থেকেও নাটোরের গুরুত্ব কম নয়। এখানকার নাটোর সুগার মিলে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত আশপাশের কৃষকদের আখ মাড়াই চলে। এই বিশাল আখের ফলন থেকেই চিনির পাশাপাশি তৈরি হয় দারুণ স্বাদের খাঁটি sugarcane jaggery।
নাটোরে গিয়ে আসল কাঁচাগোল্লার স্বাদ না নেওয়া একরকম অসম্ভব। ২০২৩ সালের আগস্টে এটি বাংলাদেশের ১৭তম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়[1][2]। কাঁচাগোল্লা কিন্তু গোল কোনো মিষ্টি নয়, এটি দেখতে নরম আর ঝরঝরে দানাদার। গরুর খাঁটি দুধের নরম ছানার সাথে চিনির গরম রস ৩:১ কিংবা ৪:১ অনুপাতে মিশিয়ে কম আঁচে আলতো করে নেড়ে এটি তৈরি করা হয়[1]।
আসল কাঁচাগোল্লা তেলে ভাজা হয় না এবং এতে ছানার ভেজা ভাব বজায় থাকে। তাই সাধারণ তাপমাত্রায় (২৫°-৩০° সে.) এটি মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা ভালো থাকে। তবে ফ্রিজে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখলে ৪ থেকে ৫ দিন রাখা যায়। রাস্তার ধারের অনেক দোকানে ছানায় ময়দা বা গুঁড়ো দুধের ভেজাল মেশায়, যার ফলে আসল দানাদার ভাব ও নরম স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। তাই কেনার সময় ভালো দোকান চিনে নেওয়া দরকার।
রাজশাহী থেকে ডে ট্যুর পরিকল্পনা: ঋতুভিত্তিক ফসলের সময়সূচি
বরেন্দ্র অঞ্চলের আসল রূপ দেখতে হলে কৃষির মৌসুম মাথায় রেখে ঘোরার পরিকল্পনা করা ভালো। কোন সময়ে কোন ফসলের কাজ চলে, তার একটা ধারণা নিচে দেওয়া হলো:
| গন্তব্য | রাজশাহী থেকে দূরত্ব | প্রধান কৃষি কার্যক্রম | প্রধান ফসলের মৌসুম |
|---|---|---|---|
| পুঠিয়া | পূর্ব দিকে ৩০ কিমি | আখ সংগ্রহ, কলা কাটা (সবরি), দিঘিতে মাছ চাষ | নভেম্বর – মার্চ (আখ) |
| বাঘা | দক্ষিণ-পূর্বে ৪০ কিমি | আম সংগ্রহ; খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি | মে – আগস্ট (আম); নভে – ফেব্রু (গুড়) |
| নাটোর | পূর্ব দিকে ৪৮ কিমি | চিনিকলের মাড়াই কার্যক্রম; টাটকা কাঁচাগোল্লা তৈরি | সারা বছর (কাঁচাগোল্লা); নভে – মার্চ (আখ) |
রাজশাহীর আম সংগ্রহের সরকারি ক্যালেন্ডার
গ্রীষ্মের দিনে বের হলে আমের মৌসুমের নিয়মকানুন জেনে নেওয়া দরকার। অপরিপক্ব আম পাড়া ঠেকাতে প্রতি বছর রাজশাহী জেলা প্রশাসন আম নামানোর নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার বেঁধে দেয়[4]। অপুষ্ট আম পাড়লে তাতে মিষ্টতা ১৪° ব্রিক্সের নিচে থেকে যায়, ফলে আম ঠিকমতো পাকে না আর স্বাদে টক ভাব থেকে যায়।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ১৫ মে থেকে দেশি জাতের গুটি আম নামানো শুরু হয়[4]। এরপর ২২ মে থেকে সুস্বাদু গোপালভোগ, ৩০ মে জনপ্রিয় Khirsapat (Himsagar) আর ১০ জুন থেকে নামানো হয় সুবাসিত ল্যাংড়া আম[4]। মৌসুমের শেষের দিকে ১৫ জুন থেকে ফজলি ও আম্রপালি এবং ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা আম সংগ্রহ শুরু হয়[4]। আম পাড়ার পর ক্ষতিকর ক্যালসিয়াম কার্বাইডের বদলে মাছি পোকা ও রোগবালাই দূর করতে безопас হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট (৫২°-৫৫° সেলসিয়াস গরম পানিতে ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখা) ব্যবহার করা হয়।

ভ্রমণের কিছু দরকারি ও ব্যবহারিক পরামর্শ
রাজশাহীর আশপাশে ঘুরে বেড়ানো বেশ সহজ, শুধু কয়েকটা বিষয় খেয়াল রাখলেই হলো:
- যাতায়াত ব্যবস্থা: শহর থেকে একটা প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস ভাড়া নিলে দিনে দিনেই পুঠিয়া ও নাটোর ভালোভাবে ঘুরে ফেলা যায়। এছাড়া রেলওয়ে স্টেশন ও শিরোইল বাস টার্মিনাল থেকে নাটোর রোডের লোকাল বাস কয়েক মিনিট পরপরই ছাড়ে।
- সময় নির্বাচন: দুপুরের কড়া রোদ আর হাইওয়ের গাড়ির চাপ এড়াতে সকাল আটটার মধ্যেই রওনা দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
- আবহাওয়া ও পোশাক: গরমে হালকা সুতি জামাকাপড় পরুন আর সাথে পর্যাপ্ত খাবার পানি রাখুন। শীতের সকালে বেশ কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাস থাকে, তাই হালকা চাদর বা জ্যাকেট সাথে রাখা ভালো।
- তথ্য যাচাই: রাজবাড়ি বা দর্শনীয় স্থানগুলোর গেট খোলার সময় কিংবা ট্রেনের সময়সূচি মাঝেমধ্যে বদলায়। বের হওয়ার দিন সকালে হোটেলের লোকজন বা স্থানীয়দের কাছ থেকে একটু জেনে নেওয়া ভালো।
রাজশাহীর মাঠঘাট আর মেঠোপথ ধরে ঘুরে বেড়ালে এ অঞ্চলের মাটি আর কৃষকদের পরিশ্রম খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করা যায়। মাটির এই খাঁটি স্বাদ যদি সাথে নিয়ে যেতে চান, তবে আমরা আছি আপনাদের পাশে। Rajshahir Mango-তে আমরা ২০১৩ সাল থেকে নিজস্ব পারিবারিক বাগানে বিষমুক্ত ও প্রাকৃতিকভাবে আম বড় করে আসছি। মে থেকে আগস্টের মৌসুমে শক্ত ১২ ও ২৪ কেজির ক্রেটে যত্ন করে প্যাক করা তাজা আম আমরা পৌঁছে দিই দেশের যেকোনো প্রান্তে। আর শীতের দিনে সরাসরি অনলাইনে সংগ্রহ করতে পারেন খাঁটি খেজুর গুড়, আখের গুড় ও প্রাকৃতিক মধু।






