প্রতি গ্রীষ্মেই দেশের নানা প্রান্তের আমপ্রেমীরা পথ চেয়ে থাকেন রাজশাহীর বাগানের প্রথম ফলটির জন্য। অপরিপক্ব ফলে কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো এড়াতে এবং গাছে পাকা ডাঁসা-মিষ্টি আম চিনে নেওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায় হলো সরকারি রাজশাহীর আম পাড়ার সময়সূচি মেনে চলা[3] Google-friendly।
গাছে প্রাকৃতিকভাবে সঠিক মিষ্টতা আর পরিপক্বতা আসতে প্রতিটি জাতের জন্যই নির্দিষ্ট পরিমাণ রোদ আর তাপমাত্রার প্রয়োজন পড়ে। সে কারণেই আম নামানোর সময়ও ভাগ করা থাকে আলাদা ধাপে[4]। মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত মৌসুমের কোন জাতের কী বৈশিষ্ট্য এবং আম পাকার সঠিক ধাপগুলো ঠিক কেমন, তা নিয়েই আমাদের এই আলোচনা।
কেন নির্ধারিত হয় রাজশাহীর আম পাড়ার সময়সূচি
প্রতি বছর রাজশাহী জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) যৌথভাবে আম সংগ্রহের একটি নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার ঘোষণা করে[1],[3]। এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তটি কিন্তু নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; ক্রেতা আর চাষি উভয়ের জন্যই এটি একটি জরুরি সুরক্ষাকবচ। আম পাড়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ বেঁধে দিলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সময়ের আগেই কাঁচা আম পেড়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বাজারে ছাড়তে পারে না[3]।
একটি আম শারীরবৃত্তীয়ভাবে পুরোপুরি পরিপক্ব (Physiological maturity) হওয়ার আগেই পেড়ে ফেললে—অর্থাৎ ফলের কাঁধ চওড়া হওয়া আর ভেতরের আঁটি শক্ত হওয়ার পূর্বে নামালে—তাতে প্রয়োজনীয় শর্করা বা স্টার্চ তৈরিই হতে পারে না[4]। এমন অপরিপক্ব আম পাকানোর চেষ্টা করলে তা রাবারের মতো শক্ত হয়ে থাকে, নয়তো পানসে লাগে; কাঙ্ক্ষিত মিষ্টতার বদলে থেকে যায় মুখে লেগে থাকা অস্বস্তিকর টক ভাব। জাতভেদে নির্ধারিত সময় মেনে আম সংগ্রহ করলেই কেবল রাজশাহীর আমের আসল স্বাদ আর মনকাড়া সুবাস পুরোদমে অটুট থাকে।
জাতভিত্তিক রাজশাহীর আম সংগ্রহের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি
গাছের সব জাতের আম কখনোই একসাথে পাকে না। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে দেশি স্থানীয় জাত দিয়ে মৌসুম শুরু হয়, আর জুলাইয়ের শেষভাগে গিয়ে শক্ত ও দারুণ মিষ্টি নাবি জাতগুলোর মাধ্যমে তা শেষ হয়[1]।
প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত আম পাড়ার সম্ভাব্য সময় এবং বিভিন্ন জাতের স্বাভাবিক মিষ্টতার মাত্রা (ডিগ্রি ব্রিক্সে পরিমাপকৃত) নিচের টেবিলে তুলে ধরা হলো:
| আমের জাত | সংগ্রহ শুরুর সম্ভাব্য তারিখ | মিষ্টতার মাত্রা (° ব্রিক্স) | শাঁসের বৈশিষ্ট্য ও ভক্ষণযোগ্য অংশ |
|---|---|---|---|
| গুটি আম (স্থানীয় জাত) | ১৫ মে | ১৫–১৮° ব্রিক্স | নানা স্বাদের; নরম শাঁস, মাঝারি আঁশ, মিষ্টি-টক ভাব |
| গোপালভোগ | ২০–২২ মে | ১৭–২০° ব্রিক্স | পাতলা হলুদ খোসা, হালকা আঁশ, চমৎকার সুবাস |
| রানিপছন্দ ও লক্ষণভোগ | ২৫ মে | ১৬–১৯° ব্রিক্স | উজ্জ্বল খোসা, মৃদু সুবাস, কিছুটা শক্ত গড়ন |
| ক্ষীরশাপাত / হিমসাগর | ২৫–৩০ মে | ১৮–২১° ব্রিক্স | আঁশহীন সোনালী শাঁস, ৭০–৭৫% ভক্ষণযোগ্য অংশ |
| ল্যাংড়া | ১০ জুন | ১৯–২১° ব্রিক্স | পাকলেও সবুজ আভা থাকে, তীব্র সুগন্ধি ও নরম |
| ব্যানানা ম্যাংগো | ১০ জুন | ১৭–১৯° ব্রিক্স | লম্বাটে গড়ন, সামান্য আঁশ, নরম শাঁস |
| আম্রপালি (বারি আম-৩) | ১৫ জুন | ২১–২৩.৫° ব্রিক্স | গাঢ় কমলা শাঁস, অত্যন্ত মিষ্টি ও বিটা-ক্যারোটিন সমৃদ্ধ |
| ফজলি | ১৫ জুন | ১৬–১৮° ব্রিক্স | বড় আকৃতি (৪০০–৮০০ গ্রাম), শাঁসের পরিমাণ বেশি (>৭৫%) |
| বারি আম-৪ | ৫ জুলাই | ১৮–২০° ব্রিক্স | মাঝারি-বড় আকৃতি, হাইব্রিড জাত, সমানভাবে পাকে |
| আশ্বিনা | ১০ জুলাই | ১৫–১৮° ব্রিক্স | সবুজ পুরু খোসা, মাংসল শাঁস, মিষ্টি-টক স্বাদ |
| গৌড়মতি | ১৫ জুলাই | ২৪–২৫° ব্রিক্স | চ্যাপ্টা ছোট আঁটি, প্রায় ৯০% ভক্ষণযোগ্য শাঁস, দারুণ মিষ্টি |
কাটিমন কিংবা বারি আম-১১ এর মতো বারোমাসি জাতগুলো অবশ্য এই মৌসুম ছাড়াও প্রায় সারা বছর মুকুল ও ফল দেয়। তবে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী মৌসুমি জাতগুলো এই নির্দিষ্ট সময়সীমার নিয়ম মেনেই গাছ থেকে নামানো হয়।

মৌসুমের শুরু: গুটি, গোপালভোগ ও ক্ষীরশাপাত (মে মাসের শেষভাগ)
সাধারণত ১৫ মের দিকে গুটি আম ভাঙার মাধ্যমে রাজশাহীতে আম নামানো শুরু হয়[3]। গুটি মূলত স্থানীয় বীজ থেকে হওয়া রকমারি দেশি আমের সাধারণ নাম। একেক গাছের গুটি আমের আকার ও স্বাদ একেক রকম; তবে মৌসুমের শুরুতেই ক্রেতাদের পাতে মিষ্টি আর হালকা টকের দারুণ এক স্বাদ এনে দেয় এটি। বাগানিরা এই শুরুর দিনগুলোতে মূলত ফল তোলার সরঞ্জাম গোছানো ও প্যাকেটজাতকরণের প্রস্তুতি সেরে নেন।
এরপর মে মাসের ২০ থেকে ২২ তারিখের মধ্যে বাজারে চলে আসে মৌসুমের প্রথম উন্নত জাতের আম অভিজাত গোপালভোগ আম। পুরো পাকার পর গোপালভোগের খোসায় হালকা সোনালী-হলুদ আভা ফুটে ওঠে আর এর মিষ্টতা পৌঁছায় ১৭ থেকে ২০ ডিগ্রি ব্রিক্স পর্যন্ত। এর শাঁসে খুব সামান্য নরম আঁশ থাকে, যা কেটে খাওয়ার জন্য বেশ উপযোগী।
মে মাসের ২৫ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে বাগানে নামে ক্ষীরশাপাত। রাজশাহীর আগাম জাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সমাদৃত জাত এটিই, যা বাজারে বেশিরভাগ মানুষ হিমসাগর আম নামে চেনেন। সুগন্ধি আর রসে টইটম্বুর এই আমের জাফরানি শাঁস একেবারেই আঁশহীন। ফলের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ অংশই খাওয়ার যোগ্য, যা এক বসাতেই খাঁটি রসনার পূর্ণ তৃপ্তি জোগায়।
ভরা মৌসুম: ল্যাংড়া, আম্রপালি ও ফজলি (জুন মাস)
জুন মাসে এসেই আমের ভরা মৌসুম পুরোপুরি জমে ওঠে। ১০ জুনের দিকে গাছ থেকে নামানো শুরু হয় ল্যাংড়া ও ব্যানানা ম্যাংগো[1]। আমাদের অঞ্চলের বিখ্যাত ল্যাংড়া আম-এর রূপই আলাদা; আম পুরোপুরি পেকে গেলেও খোসা কিন্তু বেশ কিছুটা হালকা সবুজ থেকেই যায়। আর সেই সবুজ খোসার নিচেই লুকিয়ে থাকে তীব্র সুবাসিত, নরম শাঁস—যার মিষ্টি ও হালকা টকের অসাধারণ ভারসাম্য পৌঁছায় ১৯ থেকে ২১ ডিগ্রি ব্রিক্স পর্যন্ত।
১৫ জুনের মধ্যে শুরু হয়ে যায় আম্রপালি (বারি আম-৩) আর ফজলি নামানোর তোড়জোড়[1]। অতুলনীয় মিষ্টতার কারণে দেশের সব প্রান্তেই আম্রপালি নিজস্ব একটি জায়গা করে নিয়েছে, যার ব্রিক্স রিডিং অনেক সময় ২১ থেকে ২৩.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে[6]। গাঢ় কমলা শাঁসের এই আমে প্রচুর বিটা-ক্যারোটিন থাকে। তবে খোসা পাতলা হওয়ায় নাবি জাতগুলোর তুলনায় আম্রপালি কিছুটা দ্রুত নরম হয়ে আসে।
একই সময়ে গাছ থেকে নামানো হয় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী পেল্লাই আকারের ফজলি আম[1]। ওজনে একেকটি ফজলি আম সাধারণত ৪০০ থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর ৭৫ শতাংশেরও বেশি অংশজুড়ে থাকে মাংসল শাঁস, আর তাতে থাকে ১৬ থেকে ১৮ ডিগ্রি ব্রিক্সের মতো আরামদায়ক মিষ্টতা। পাকা ফজলি যেমন কেটে খাওয়ার জন্য জুতসই, তেমনি কাঁচা-মিঠা অবস্থায় এটি আচার ও চাটনির জন্যও চমৎকার।

নাবি মৌসুম ও সংরক্ষণ: আশ্বিনা, গৌড়মতি এবং সংগ্রহের পরবর্তী যত্ন
জুলাই মাসে যখন উত্তরবঙ্গে বর্ষা পুরোদমে নামে, তখন শুরু হয় নাবি জাতের আম তোলার পর্ব। ৫ জুলাইয়ের দিকে বারি আম-৪ আর ১০ জুলাইয়ের দিকে বাজারে আসে আশ্বিনা আম[1]। আশ্বিনা আমের শাঁস কিছুটা শক্ত ও আঁশযুক্ত; মিষ্টির পাশাপাশি একটু টকের ছোঁয়া পছন্দ করেন এমন মানুষের কাছে এটি খুবই প্রিয়।
আমের মূল মৌসুমের বিদায় ঘটে ১৫ জুলাইয়ের দিকে গৌড়মতি আম নামানোর মাধ্যমে[1]। আধুনিক উদ্যানতত্ত্বের অনন্য এক সংযোজন এই গৌড়মতি, যার মিষ্টতা পৌঁছে যায় অবিশ্বাস্য ২৪ থেকে ২৫ ডিগ্রি ব্রিক্সে। ভেতরের আঁটি অত্যন্ত পাতলা হওয়ায় এর প্রায় ৯০ শতাংশ অংশই খাওয়া যায়। গ্রীষ্মের আম মৌসুমের মিষ্টি সমাপ্তি ঘটে এই জাতটি দিয়েই।
আম সংগ্রহের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও খাদ্য নিরাপত্তা
শুধু আম পাড়ার তারিখ মেনে নিলেই চলে না, ফল সংগ্রহের সঠিক কৌশল জানাটাও সমান জরুরি। আম পাড়ার সময় বোঁটা ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার রেখে কাটা উচিত, যাতে বোঁটার অম্লীয় কষ ফলের খোসায় না লাগে। পাড়ার পর ফলগুলোকে বোঁটা নিচের দিকে রেখে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রাখা হয় কষ ঝরে যাওয়ার জন্য; তা না হলে এই কষের দাগ থেকেই পরে ছত্রাকের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
অ্যানথ্রাকনোজ (Colletotrichum) রোগ ও ফলের মাছি পোকার আক্রমণ প্রাকৃতিকভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উদ্ভাবিত হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট (HWT) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে আমকে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (±১ ডিগ্রি) তাপমাত্রার পানিতে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখা হয়, যা কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক ছাড়াই আমের সংরক্ষণকাল ৮ থেকে ১০ দিন বাড়িয়ে দেয়[5]। ক্রেতাদের কখনোই সবুজ কাঁচা আম ১২-১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ফ্রিজে রাখা উচিত নয়, কারণ এতে চিলিং ইনজুরি হয়ে খোসায় দাগ পড়ে এবং আম স্বাভাবিকভাবে পাকে না। আম প্রাকৃতিকভাবে পাকাতে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় (২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) খোলা বাতাসে রাখাই সবচেয়ে ভালো।
বাগান থেকে সরাসরি আম পেতে আগাম প্রস্তুতি নিন
সঠিক রাজশাহীর আম পাড়ার সময়সূচি জেনে রাখা আপনাকে ঠিক সময়ে সেরা জাতের তাজা ফল বেছে নিতে সাহায্য করবে। আগাম মৌসুমের সুবাসিত ক্ষীরশাপাত হোক কিংবা ভরা মৌসুমের মিষ্টি আম্রপালি—সরাসরি সচেতন বাগানিদের কাছ থেকে ফল সংগ্রহ করলে স্বাদে কোনো খাদ থাকে না।
আমরা রাজশাহীর আম (Rajshahir Mango) পরিবার ২০১৩ সাল থেকে সততার সাথে আপনাদের নিরাপদ ফল সরবরাহ করে আসছি। আমরা ফলের প্রাকৃতিক পরিপক্বতা নিশ্চিত করি এবং কার্বাইড বা ক্ষতিকর হরমোন পুরোপুরি পরিহার করি। আমাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে সহজে অর্ডার করুন ১২ কেজি ও ২৪ কেজির মজবুত ক্রেটে প্যাক করা তাজা রাজশাহীর আম, যা ক্যাশ অন ডেলিভারি, কার্ড, বিকাশ ও রকেটের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়।






