কাজের তাগিদে হোক, পড়াশোনার সূত্রে কিংবা পদ্মার পাড়ে বাগানের তাজা আমের স্বাদ নিতে—ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার উপায় খুঁজলে বিকল্পের অভাব নেই[1]। রাজধানী থেকে সিল্ক সিটির যোগাযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক গোছানো। ট্রেন, বাস কিংবা বিমান—নিজের সময় আর সুবিধার ওপর নির্ভর করে পথ বেছে নেওয়া যায়।
দেশের উত্তর-পশ্চিমে শান্ত, ছিমছাম শহর রাজশাহী সড়কপথে ঢাকা থেকে প্রায় ২৪৫ থেকে ২৫৫ কিলোমিটার পশ্চিমে। ঝক্কি ছাড়া পৌঁছাতে চান, নাকি সড়ক আর নদী পারাপারের দৃশ্য দেখতে দেখতে যাবেন—পছন্দ যার যার। ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার চালু মাধ্যমগুলো দেখে নেওয়া যাক।
ট্রেনে ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার উপায়
এই রুটে চলাচলের জন্য ট্রেন সবসময়ই মানুষের প্রথম পছন্দ। আরামদায়ক তো বটেই, সময়ও বাঁচে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্রডগেজ আন্তঃনগর ট্রেনগুলো ঢাকার কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশন থেকে সরাসরি রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে যায়[2],[3]। ঢাকা ছাড়ার পর মহাসড়কের জ্যাম এড়িয়ে নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছানোর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসা এটিই।
বনলতা এক্সপ্রেস
এই পথের সবচেয়ে দ্রুতগতির ও জনপ্রিয় ট্রেন বনলতা এক্সপ্রেস। ঢাকা আর রাজশাহীর মধ্যে এটিই একমাত্র নন-স্টপ বা বিরতিহীন ট্রেন[2]। কোথাও দাঁড়ায় না বলে সময় লাগে মোটে ৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট থেকে ৪ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের মতো[2]। আধুনিক ব্রডগেজ বগির এই ট্রেনে এসি ও নন-এসি দুই ধরনের সিটই পাবেন।
নিয়মিত আন্তঃনগর ট্রেনসমূহ
বনলতার টিকিট না মিললে বাকি তিন নিয়মিত আন্তঃনগর ট্রেনের যেকোনো একটি বেছে নেওয়া যায়: সিল্কসিটি এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস ও ধূমকেতু এক্সপ্রেস[2],[3]। এগুলো মাঝের বড় জংশন ও স্টেশনগুলোতে যাত্রী ওঠানামা করায়। ফলে রাজশাহী পৌঁছাতে সাধারণত ৫ ঘণ্টা ৩০ মিনিট থেকে ৬ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের মতো লাগে[3]।
ছুটির দিনগুলোতে টিকিটের চাপ থাকে বেশি। তাই যাত্রার কয়েক দিন আগেই রেলওয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে টিকিট কেটে ফেলা ভালো। মাঝেমধ্যে ট্রেনের সময়সূচিতে রদবদল হয়, তাই স্টেশনে যাওয়ার আগে ট্রেনের বর্তমান অবস্থান বা লাইভ ট্র্যাকিং দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে[3]।
মহাসড়কে ভ্রমণ: দূরপাল্লার বাস সার্ভিস
ট্রেনের বাঁধাধরা সময়ের বাইরে যেকোনো সময় রওনা দিতে চাইলে দূরপাল্লার বাসই সবচেয়ে সহজ উপায়। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টাই এই পথে বাস চলে[1],[4]। এন৫ (N5) ও এন৬ (N6) জাতীয় মহাসড়ক ধরে বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে প্রায় ২৪৫ থেকে ২৫৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাসগুলো রাজশাহী পৌঁছায়[4]।
বাস টার্মিনাল ও প্রধান পরিবহনসমূহ
ঢাকার গাবতলী আর কল্যাণপুর থেকেই মূলত রাজশাহীর বাসগুলো ছাড়ে, তবে আবদুল্লাহপুর থেকেও কিছু পরিবহনের কাউন্টার রয়েছে[1]। হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, ন্যাশনাল ট্রাভেলস কিংবা দেশ ট্রাভেলস—এই রুটে নিয়মিত ও ভরসাযোগ্য। সাধারণ নন-এসির পাশাপাশি আরামদায়ক বিজনেস ক্লাস এসি বাসও পাবেন।
ভ্রমণের সময় ও সড়কের বাস্তবতা
মহাসড়কে কোনো জট না থাকলে বাসে রাজশাহী পৌঁছাতে সাধারণত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লাগে[4]। তবে ঈদের লম্বা ছুটি, উইকেন্ডের চাপ, সেতুর টোলপ্লাজায় ভিড় কিংবা রাস্তার কাজের কারণে কখনো কখনো ৭ থেকে ৮ ঘণ্টাও কেটে যেতে পারে[1]। দিনের ট্র্যাফিক এড়াতে খুব ভোরের বাস ধরা সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল।

ঢাকা থেকে রাজশাহী সরাসরি ফ্লাইট
হাতে একদমই সময় নেই, দ্রুত পৌঁছানো জরুরি—এমন ক্ষেত্রে আকাশপথই সেরা। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (DAC) থেকে সরাসরি রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে (RJH) বিমান চলে[5],[6]।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এই রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে[5]। ঢাকা থেকে উড়াল দিয়ে রাজশাহী নামতে সময় লাগে মাত্র ৪৫ থেকে ৫৫ মিনিট[6]। বিমানবন্দরটি শহর থেকে কিছুটা উত্তরে অবস্থিত; সেখান থেকে অটোরিকশা বা ট্যাক্সি নিলে ২০-৩০ মিনিটের মধ্যেই শহরের প্রাণকেন্দ্রে পৌঁছানো যায়। তবে যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের শিডিউলটা একবার দেখে রাখা ভালো।
অন্যান্য শহর থেকে রাজশাহী যাতায়াত
দেশের অন্য প্রান্ত থেকেও রাজশাহী আসা খুব জটিল কিছু নয়। ব্রডগেজ লাইনের সুবাদে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ খুবই চমৎকার, তবে পূর্বদিকের জেলাগুলো থেকে আসতে কিছুটা পরিকল্পনা লাগে।
- খুলনা থেকে: সরাসরি ব্রডগেজ ট্রেন রয়েছে—সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমতল জনপদ পেরিয়ে রাজশাহী পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা।
- চট্টগ্রাম থেকে: রেললাইনের পার্থক্যের কারণে সরাসরি ট্রেন মেলে না বললেই চলে। সাধারণত ঢাকায় বিরতি দিয়ে কিংবা জয়দেবপুর বা ঈশ্বরদী জংশনে ট্রেন বদল করে আসতে হয়[3]। তবে সড়কপথে চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি বেশ কিছু রাতের বাস ছাড়ে।
- সিলেট থেকে: সরাসরি যাতায়াত ব্যবস্থা সীমিত। বাস বা ট্রেনে ঢাকা হয়ে আসতে হয়, অথবা ট্রেনে এলে জয়দেবপুর জংশনে নেমে রাজশাহীগামী ট্রেন ধরতে হয়।

ঢাকা থেকে রাজশাহী যাতায়াতের তুলনামূলক তালিকা
নিজের সময় ও বাজেট মেলাতে এক নজরে দেখে নিন যাতায়াতের মাধ্যমগুলো:
| যাতায়াতের মাধ্যম | গড় সময় | প্রধান বোর্ডিং পয়েন্ট | প্রধান সার্ভিস বা অপারেটর |
|---|---|---|---|
| দ্রুততম ট্রেন | ৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট – ৪ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট | কমলাপুর, বিমানবন্দর স্টেশন | বনলতা এক্সপ্রেস (নন-স্টপ)[2] |
| নিয়মিত ট্রেন | ৫ ঘণ্টা ৩০ মিনিট – ৬ ঘণ্টা ৩০ মিনিট | কমলাপুর, বিমানবন্দর স্টেশন | সিল্কসিটি, পদ্মা, ধূমকেতু এক্সপ্রেস[2],[3] |
| দূরপাল্লার বাস | ৫ ঘণ্টা – ৮ ঘণ্টা (যানজটের ওপর নির্ভর করে) | গাবতলী, কল্যাণপুর, আবদুল্লাহপুর | হানিফ, শ্যামলী, ন্যাশনাল, দেশ ট্রাভেলস[1] |
| অভ্যন্তরীণ বিমান | ৪৫ – ৫৫ মিনিট (উড়ালকাল) | হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর | বিমান বাংলাদেশ, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স[5],[6] |
আমের মৌসুমে রাজশাহী ভ্রমণের কিছু দরকারি পরামর্শ
মে থেকে আগস্ট—গ্রীষ্মের এই সময়টায় রাজশাহীর চেহারা বদলে যায়। চারদিকে কাঁচা-পাকা আমের ঘ্রাণ। বাগানে গিয়ে গাছের পাকা ফলের স্বাদ নিতে চাইলে কোন আম কখন নামে, সেটা জেনে আসা ভালো।
মে মাসের মাঝামাঝি গুটি আম দিয়ে মৌসুমের শুরু। এর পরপরই মে-র শেষের দিকে পাকতে শুরু করে পাতলা চামড়ার মিষ্টি গোপালভোগ আম। জুনের প্রথম ভাগে নামে রসালো ও আঁশহীন হিমসাগর আম, জুনের মাঝামাঝি আসে তীব্র সুবাসের ল্যাংড়া আম আর জুনের শেষ থেকে জুলাই জুড়ে পাওয়া যায় নাযুক সাইজের বিখ্যাত ফজলি।
বাগান থেকে আম কিনে বাড়ি ফেরার সময় কখনোই মুখবন্ধ পলিথিন বা বাতাস চলাচলহীন বাক্সে গরম আম ভরবেন না। ফলের ভাপ আটকে আম দ্রুত পচে যায়। বাতাস চলাচল করে এমন শক্ত কাগজের কার্টনে আম রাখুন এবং গাড়িতে ছায়াযুক্ত জায়গায় বসান, যাতে দাগ না পড়ে বা থেঁতলে না যায়।
আর যদি ভ্রমণের ব্যস্ততায় ভারী ফলের কার্টন বয়ে নেওয়ার ঝামেলায় না জড়াতে চান, তবে ঘরে বসেই আসল রাজশাহীর ফল পেতে পারেন। ২০১৩ সাল থেকে আমাদের 'রাজশাহীর আম' টিম সরাসরি গাছ থেকে খাঁটি, রাসায়নিকমুক্ত আম সংগ্রহ করে আসছে। নিরাপদ প্যাকেজিংয়ে ১২ ও ২৪ কেজির কার্টনে পৌঁছে দিই দেশের যেকোনো ঠিকানায়। মৌসুমে বাগানের টাটকা ফল দেখতে চোখ রাখুন আমাদের তাজা আমের কালেকশন পেজে।






