পদ্মার পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা রাজশাহীর ইতিহাস বহু পুরনো। ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসনিক গুরুত্ব আর স্থানীয় কারিগরদের হাতের কাজ মিলেমিশে এ শহর আজকের রূপ পেয়েছে। শান্ত নদীপারের এক সাধারণ বাণিজ্যকেন্দ্র কীভাবে অবিভক্ত বাংলার নামকরা রেশম আর সুস্বাদু ফলের কেন্দ্র হয়ে উঠল, তার পেছনে রয়েছে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের মেহনত।
দেশজুড়ে মানুষ একে চেনে ‘রেশম নগরী’ নামে। চওড়া নদীর ধার, পুরনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের টানে ইতিহাসপ্রেমীরা আজও ছুটে আসেন উত্তরের এই শহরে।
রামপুর-বোয়ালিয়া থেকে রেশম নগরী: রাজশাহীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন
আজকের বিভাগীয় শহরটি একসময় পরিচিত ছিল রামপুর-বোয়ালিয়া নামে[3]। পদ্মার তীরবর্তী হওয়ায় এখানকার মাটি পলি পেয়ে যেমন উর্বর হয়েছে, তেমনই নদীপথের সুবাদে পূর্ব ও মধ্য বাংলার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোও সহজ ছিল[3]।।
ত্রয়োদশ শতকের গোড়ার দিকেই এ অঞ্চলে তুঁত চাষ আর রেশম তৈরির চল শুরু হয়[1]। পরের কয়েক শতকে এখানকার তাঁতিদের বোনা মসৃণ সিল্ক ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে ‘গ্যানজেস সিল্ক’ বা ‘বেঙ্গল সিল্ক’ নামে সুনাম কুড়ায়[4]।।
আঠারো ও উনিশ শতকে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের নজর পড়ে এখানকার রেশম গুটির ওপর[3]। সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে গুটি কিনে সুতা তৈরির জন্য ডাচ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রামপুর-বোয়ালিয়া ও আশপাশের এলাকায় বাণিজ্য কুঠি খোলে[3],[4]।।
দেশভাগের পর এ শিল্পকে নতুন রূপ দেওয়া হয়। ১৯৬১ সালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু হয় রাজশাহী রেশম কারখানা[4]। তুঁতচাষিদের সহায়তা দিতে এবং সুতার মান ধরে রাখতে ১৯৭৭-৭৮ সালে তৈরি হয় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড[4]। কারিগরদের শতবর্ষের এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে ‘রাজশাহী সিল্ক’ জিআই (GI) সনদের মর্যাদা পায়[5]।।
রাজশাহী কেন রেশম নগরী: তুঁত চাষ থেকে তাঁতের বুনন
রাজশাহীকে এমনিতে ‘রেশম নগরী’ বলা হয় না। তুঁত গাছের ডাল পোঁতা থেকে শুরু করে শাড়ির জমিন তৈরি—সব কাজই হয় এই অঞ্চলে[1],[4]। রেশম এখানে শুধুই কারখানার বিষয় নয়, মাটি থেকেই যত্ন করে তৈরি করা হয়।
তুঁত চাষ ও রেশম পোকা পালন
কাজের গোড়াপত্তন তুঁত গাছ (Morus alba) লাগানো দিয়ে। নদীর পলি আর বরেন্দ্র মাটির সংমিশ্রণে তুঁত বেশ ভালো বাড়ে। রাজশাহী শহরের বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থানীয় গুটিপোকার উপযোগী বিএম-৪, বিএম-৫ এবং বিএম-১১-এর মতো উচ্চ ফলনশীল জাত তৈরি করেছে।
পোকার ডিম ফোটার সাথে মিলিয়ে কচি পাতা জোগাড় করতে বছরে দুই-তিনবার তুঁতের ডাল ছাঁটা হয়। দেশে মূলত চারটি প্রধান মৌসুমে বাণিজ্যিকভাবে রেশম পোকা (Bombyx mori) পালন করা হয়[2]:
- চৈত্রিক: ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ
- বৈশাখী: এপ্রিল থেকে মে
- শ্রাবণী: জুলাই থেকে আগস্ট
- অগ্রহায়ণীয়: নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর
পোকা পালনে ঘরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার দিকে খুব খেয়াল রাখতে হয়। ২২ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশ আর্দ্রতায় পোকাগুলো রাখা হয়। টানা ২৪ থেকে ২৮ দিন কচি তুঁত পাতা খেয়ে বড় হওয়ার পর পোকার মুখ থেকে আঠালো লালা বের হতে থাকে, আর তাতেই তৈরি হয় শক্ত রেশম গুটি বা কোকুন।

সুতা কাটা ও বুননের সূক্ষ্ম কারিগরি
গুটি তৈরি হয়ে গেলে চাষিরা সাবধানে তা তুলে নেন। এরপরের কাজটি খুব সতর্কতার। শুকনো গুটি ৯০ থেকে ৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গরম পানিতে দুই-তিন মিনিট সেদ্ধ করা হয়[2]। এতে গুটির আঁঠালো সেরিসিন প্রোটিন নরম হয়ে আসে, কিন্তু ভেতরের আসল তন্তু বা ফাইব্রয়েন একদম নষ্ট হয় না[2]।।
পানি বেশি ফুটলে আঁশ জট পাকিয়ে যায়, আবার কম সেদ্ধ হলে সুতা টানার সময় ছিঁড়ে যায়। দক্ষ কারিগররা কয়েকটি গুটি থেকে একসাথে সুতা টেনে এনে সুষম শক্তির একটি মজবুত সুতা বানান।
এক টুকরো খাঁটি রেশমি কাপড় তৈরিতে কতটা ধৈর্য লাগে, নিচের হিসাবটি দেখলে তা পরিষ্কার হবে[2]:
| পরিমাপের বিষয় | প্রমিত উৎপাদন মাত্রা |
|---|---|
| একটি কোকুন থেকে প্রাপ্ত সুতার দৈর্ঘ্য | ৬০০ থেকে ১,০০০ মিটার নিরবচ্ছিন্ন তন্তু |
| একটি সিল্ক শাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় কোকুন | প্রায় ৫,০০০টি আস্ত কোকুন |
| বছরে বাণিজ্যিক রেশম পালন মৌসুম | ৪ থেকে ৫টি নিয়মিত ব্যাচ |
| লার্ভার পাতা খাওয়ার সময়কাল | ২৪ থেকে ২৮ দিন নিয়মিত পাতা সরবরাহ |
এই সুতা দিয়েই তৈরি হয় হালকা মালবেরি বা তুত সিল্ক, পরতে আরামদায়ক এন্ডি সিল্ক আর একটু ভারী টেক্সচারের মটকা সিল্ক[2]। রাজশাহীর সিল্কের নিজস্ব উজ্জ্বলতা, গায়ের সাথে লেগে থাকার ভাব আর টেকসই গুণের কারণে মানুষ আজও একে এত পছন্দ করে।
রেশমের বাইরেও ঐতিহ্য: বরেন্দ্র মাটি ও সুস্বাদু আমের বাগান
রেশম যেমন রাজশাহীর কারিগরদের পরিচয়, তেমনই এখানকার রোদ আর উর্বর মাটি ফলমূলের জন্য সেরা। বরেন্দ্র মাটির বিশেষ গুণ আর পদ্মা নদীর পলি—দুটো মিলেই এখানকার ফলের স্বাদ ও সুবাস আলাদা হয়।
রেশমের মতোই রাজশাহীর আম জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। এ অঞ্চলের ক্ষীরশাপাত আর ফজলি আম ঐতিহাসিক রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ বলয়ের স্বীকৃত ফসল[5],[6]।।
গ্রীষ্মের শুরুতেই পদ্মা তীরবর্তী বাগানগুলোতে আম নামানোর ধুম পড়ে যায়:
- মে মাসের শেষভাগ: পাতলা খোসার মিষ্টি গোপালভোগ আম দিয়ে শুরু হয় আমের বাজার।
- জুন মাসের শুরু থেকে মাঝামাঝি: নামতে শুরু করে আঁশহীন ও সুগন্ধি প্রিমিয়াম হিমসাগর আম (ক্ষীরশাপাত)।
- জুনের শেষ থেকে জুলাই: বড় আকারের মিষ্টি নাবি জাতের ফজলি আম নামলে মৌসুম শেষের দিকে যায়।

রাজশাহী ভ্রমণকারীদের জন্য কিছু দরকারি পরামর্শ
রাজশাহীর এই রূপ দেখতে চাইলে ঠিক সময়ে আসা জরুরি। পদ্মার বাঁধে হাঁটা, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর ঘুরে দেখা কিংবা রেশম তৈরির কাজ স্বচক্ষে দেখতে চাইলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শীতের সময়টাই সবচেয়ে ভালো।
আর যদি ফলের ভরপুর মৌসুম দেখতে চান, তবে মে মাসের শেষ থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে আসতে পারেন। খুব ভোরে বানেশ্বর হাটে গেলে বোঝা যায় এ অঞ্চলের ফল ব্যবসার বিশাল রূপ।
ঢাকা থেকে সড়কপথ ছাড়াও সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন ও ফ্লাইটে সহজেই রাজশাহী পৌঁছানো যায়। তবে পদ্মায় নৌকাভ্রমণ বা রেশম প্রদর্শনীর সময়সূচি ঋতুভেদে বদলাতে পারে, তাই আসার আগেই খোঁজখবর নিয়ে নেওয়া ভালো।
আপনার ঘরে রাজশাহীর ঐতিহ্যের আসল স্বাদ
রাজশাহীর এই ফলের ঐতিহ্যের সাথে আমাদের কাজ সরাসরি জড়ানো। ২০১৩ সাল থেকে আমরা রাজশাহীতে নিজেদের তত্ত্বাবধানে বাগান পরিচালনা করে আসছি। গাছে কোনো ক্ষতিকর কার্বাইড বা কৃত্রিম রাসায়নিক ব্যবহার না করে প্রাকৃতিকভাবে আম পাকানোই আমাদের নিয়ম।
মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত পুরো মৌসুমে গাছপাকা আম যত্ন করে বেছে ১২ কেজি ও ২৪ কেজির মজবুত প্লাস্টিক ক্যারেটে প্যাক করা হয়। কুরিয়ারের মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের যেকোনো প্রান্তে পৌঁছে যায় রাসায়নিকমুক্ত রাজশাহীর তাজা আম, সাথে ক্যাশ অন ডেলিভারি ও অনলাইন পেমেন্টের সুবিধাও রয়েছে।
ঐতিহাসিক রেশমের শহর দেখতে চাইলে রাজশাহী ঘুরে যান, আর ঘরে বসে আসল স্বাদের ফল খেতে চাইলে মৌসুমের আমটি বেছে নিন। উত্তরের মাটির স্বাদ আর আন্তরিকতা আপনি ঠিকই অনুভব করবেন।






